14/03/2023
কাচ্চি নিয়ে এতো ভালো লেখা, আমি আগে পড়ি নি। শুধু ভালো বললে কম বলা হবে, লেখাটা অসাধারণ হইছে। লেখাটা ইকটু বড়। কিন্তু লেখাটা পড়লে আপনার মনে হবে না, সময় নষ্ট করেছেন। বরঞ্চ অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভের সম্ভবনাই বেশি। সম্ভব হলে লেখাটা পইড়েন। লেখাটা লিখেছেন রিয়াদ মজিদ।
কাচ্চিঃ বিলুপ্তির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
কাচ্চি বিরিয়ানি সারাদেশেই একটি পরিচিত নাম, বিয়ে বাড়ির লোভনীয় ডিশ। কাচ্চি আপু থেকে কাচ্চি ফুপু নামক নানাবিধ নামে কাচ্চি রেস্টুরেন্টে দেশ সয়লাব। সম্প্রতি কাচ্চি আবার নূতন ভাবে আলোচনায় কাচ্চিতে ব্যবহৃত সন্দেহজনক মাংসের ব্যবহারে। মূল আলোচনায় যাবার আগে এ ব্যপারে কয়েকটা কথা বলে নেই, অন্যথা কাচ্চি ভক্তরা আগেই আমাকে দিয়ে কাচ্চি রান্না করে কুকুরকে খাইয়ে দেবে।
সুলতান ডাইনস কেন, কোন পরিচিত কিংবা চালু রেস্টুরেন্টেই কুকুরের মাংস খাওয়াবে না। কেন খাওয়াবে না, তার প্রধান কারন সমূহ মোটামুটি নিম্নরূপ।
- ঢাকার অনেক রেস্টুরেন্টের কাচ্চির মাংসেই এমন চিকন হাড় দেখা যায়। এর কারন হলো তারা সস্তা দামে ছাগল কিংবা ছোট খাশী কিনে। এদের হাড় এমন সাইজেরই হয়।
- কুকুর ধরা এবং ধরার পর তাকে গোপনে জবাই করা মোটেও সহজ ব্যপার না। সম্ভব হলেও সেটা ব্যয়বহুল হবে, টাকা দিয়ে অনেকের মুখ বন্ধ রাখতে হবে।
- একটি চালু রেষ্টুরেন্ট চেষ্টা করে, খরচ কম রেখে যতটা ভাল ভাবে খদ্দেরকে খুশী রাখা যায়। একদম ১ কেজি সাইজের ইলিশ না দিয়ে হয়ত ৮০০ গ্রামের ইলিশ দিবে, কিন্তু কখনোই জাটকা ইলিশ দিবে না। সে জানে ন্যূনতম মান বজায় না রাখলে তার ব্যবসা চলবে না।
- সর্বোপরি, রেষ্টুরেন্ট চালিয়ে রাখার মত অফুরন্ত কুকুর নেই।
যারা হাড়ের সাইজ দেখে প্রানী নির্ণয় করতে পারেন, তাদের জন্য একটি গল্প।
মহল্লার এক নির্জন কোনে বসে কতিপয় ছেলে ছোকড়ারা গাঁজা খাচ্ছে। এমন সময় মুরুব্বী গোছের লোক পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল। ছেলেরা তাকে দেখে হাতের সিগারেট লুকিয়ে ফেলেছে, কিন্তু গাঁজার গন্ধ তার নাকে ঠিকই লেগেছে।
সে এগিয়ে এসে ধমকাতে শুরু করল,
তোমরা এত উচ্ছন্নে গেছ, দিন দুপুরে বসে গাজা খাচ্ছো। তোমাদের বয়সেতো আমরা সিগারেটও চিনতাম না।
সবাই চুপ।
এর মধ্যে ঝন্টু বলে উঠল, “আংকেল, আমরা যে গাজা খাচ্ছি তা আপনি বুঝলেন কিভাবে?”
এবার আংকেল চুপ।
এবার মূল বিষয়ে আসি।
বিরিয়ানি বর্তমানে উপমহাদেশের সিগনেচার ডিস হলেও মধ্য এশিয়ার অনেক দেশেই বিভিন্ন নামে বিরিয়ানির মত খাবার প্রচলিত। তবে আমাদের নিজস্ব রন্ধন শৈলী এবং মসল্লা, বিরিয়ানিকে সম্পূর্ন ভিন্ন বৈশিষ্ঠ দিয়েছে। বিরিয়ানির উৎস নিয়ে বহু মতবাদ রয়েছে। তবে আমার কাছে গ্রহনযোগ্য মনে হয়েছে সম্রাট শাহজাহানের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাটি। ১৬৩৮ এর দিকে সম্রাট শাহজাহান লাল কেল্লার কাজ শুরু করেন। অনেক সময় তিনি নির্মান কাজ ঘুরে ফিরে দেখতেন। এমনই একদিন পরিদর্শনের সময় নির্মান কর্মীদের থাকার জায়গাঁর পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। তখন অদ্ভুত সুন্দর এক খাবারের ঘ্রান তার নাকে আসে। প্রাসাদে ফিরে এসে প্রধান পাচককে ডেকে ঘটনাটি বলেন, সাথে নির্দেশ দেন কে কি খাবার রান্না করছিল তা জানার জন্য।
বাদশাহী বাবুর্চী খবর নিতে গিয়ে জানতে পারেন, সে সময়ে সবাই কাজে থাকে, কেউ ডেরায় থাকে না। ঘটনা হলো, শ্রমিকরা রান্না করার সময় পায় না, তাই সকালে কাজে বের হবার আগে, এক হাড়িতে চাল, ডাল, মাংস মিলিয়ে তার মুখ ময়দার ডেলা দিয়ে সিল করে দেয়। অল্প আঁচে ঘন্টার পর ঘন্টা পাকতে থাকে, তারা যখন খেতে আসে, খাবার প্রায় প্রস্তুত হয়ে যায়। সেদিন মাংস আর চাল ছিল। রান্না সম্পূর্ন হয়ে গেলে ময়দার সিল ভেংগে খাবারের ঘ্রান বের হয়, আর সেটাই সম্ভবত বাদশাহর নাকে এসেছে। পরে বাদশাহী বাবুর্চীর তার মনের এবং শাহী মসল্লার মাধুরী মিশিয়ে রান্না শুরু করেন বিরিয়ানি, যা ছড়িয়ে পরে মুঘল সামরাজ্যে।
যদি এ ঘটনা বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বিরিয়ানি রান্না শুরু হয়েছিল কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়ে, যা ভারত ও পাকিস্তানে দম বিরিয়ানি নামেই বেশী পরিচিত। এভাবে দমে বিরিয়ানি রান্নার সমস্যা হলো, চাল মাংস সহ অন্যান্য উপকরণের সঠিক অনুপাত এবং কি তাপে ততক্ষন রাখতে হবে তার নিখুঁত ভারসাম্য করতে হয়। ফলে বিরিয়ানির কিছু সহজ সংস্করনও তৈরী হয়, যা হলো পোলাও আর মাংস আলাদা রান্না করে পরে মিলিয়ে দিয়ে বা স্তরে স্তরে সাজিয়ে আরেকটু দম দিয়ে ফিনিসড প্রোডাক্ট বের করা, অনেকটা “মেড ইন জাপান, এসেমবলড ইন তাইওয়ান” এর মত। এসব বিরিয়ানিই এখন বিরিয়ানি হিসেব বহুল প্রচলিত এবং সহজলভ্য।
ভারতে দম বিরিয়ানি থাকলেও বাংলাদেশের ঢাকাই কাচ্চির মত অনন্য নয়।
কয়েক দশক আগেও ঢাকায় অনেক বিরিয়ানির দোকান ছিল, কিন্তু অধিকাংশই এসেমবলড বিরিয়ানি। এক ডেগে পোলাও থাকত, আরেক পাতিলে মুরগির এক চতুর্থাংশ, দুটো মিলিয়ে খাদককে পরিবেশন করা হতো। বিয়ে বাড়িতেও ছিল পোলাও, রোস্ট, রেজালার প্রচলন। কাচ্চি বিরিয়ানি ছিল পুরনো ঢাকার একদম আভ্যন্তরীন খাবার। তারা নিজেদের অনুষ্ঠানে কিংবা বিয়েতে বা স্বল্পপরিসরের কোন আয়োজনে কাচ্চি রান্না করত। এমনকি দেশ ভাগের পর বিহার থেকে আসা বিহারি পল্লীতে কাবাব সহ মুঘলাই অনেক খাবারের সমারোহ থাকলেও, কাচ্চি ছিল নিতান্তই পুরান ঢাকার ব্যপার, যারা নবাবী আমল থেকে সেখানে বসবাস করছে। এমনকি কোন রেস্টুরেন্টেও তেমন কাচ্চি বিক্রি হতো না। তাই পুরনো ঢাকার বাসিন্দা না হলে কাচ্চির স্বাদ পাওয়ার সম্ভাবনাই ছিল ক্ষীন।
বলা চলে স্টার হোটেল (রেস্টুরেন্ট) প্রথম কাচ্চির একটি সস্তা সংস্করন তৈরী করে গনমানুষের জন্য। কাচ্চি কোন সস্তা খাবার না, তার পরেও অল্প টাকায় কাচ্চির একটি সংস্করণ তারা জনপ্রিয় করে তোলেন, আর তাদের দেখাদেখি ঢাকার অনেক রেস্টুরেন্ট কাচ্চি পরিবেশন শুরু করে। বলা চলে একই ধারাবাহিকতায় ফখরুদ্দিনের মত বড় বাবুর্চিরা বিয়ে বাড়ির জন্য কাচ্চি রান্না করেন এবং পরবর্তীতে কাচ্চি হয়ে যায় বিয়ের সিগনেচার ফুড।
এর পরবর্তী অবস্থা হলো অলি গলি, আনাচে কানাচে কাচ্চি আর কাচ্চি। এর সাথে যোগ হলো আরেকটি মনস্তাত্বিক সমস্যা। এক সময় গুলিস্থান ফার্মগেটের মত ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোতে বিরিয়ানি বলতে চিকেন বিরিয়ানি পাওয়া যেত, যা ছিল মুরগীর এক রান সাথে পরিমিত সাদা পোলাও, অতএব দামও পরিমিত। কাচ্চি বিরিয়ানিকে সেই চিকেন বিরিয়ানির দামের সাথে তাল মিলাতে হলো। সেই ২০ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া কাচ্চি কয়েক বছর আগে স্টারে বিক্রি হতো ১৬০-১৭০ টাকায়। কিন্তু তখন স্টারে ভাত মাছ/মাংস ডাল সব্জি খেতেও ২০০ টাকা বের হয়ে যেত। মানে রিচ-ফুড বিরিয়ানি হয়ে গেল মিডল ক্লাস ফুড। সীমিত টাকায় লাঞ্চ করবেন?
ঢুকে হয়ত মাটন ভুনা খিচুরী নিলেন, অথবা কাচ্চি, হয়ে গেল ভোজ।
ইতিমধ্যে ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্টগুলোতে কাচ্চি প্রায় স্ট্যাপল ফুড হয়ে গেছে। আপনি লাঞ্চের সময় স্টারে গিয়ে বসবেন(৫-৭ বছর আগের কথা বলছি), মুরগি, খাশী, গ্লাসি, ঝাল ফ্রাই, রুই, চিংড়ি, এমন অনেক কিছুই আছে। কিন্তু অনেকেই এটা ওটা জিজ্ঞেস করে পরে বলে, মামা একটা কাচ্চিই দাও। সুতরাং এই বিশাল খদ্দেরদের সাধ এবং সাধ্যের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে খাশীর সাইজ ছোট হতে লাগল, মাংসের সাইজ আরও ছোট, ঘিয়ের ছোয়া থেকে স্পর্শ, কাচ্চি টিকে রইল, শুধুই নামে এবং মধ্যবিত্তের দামে।
এমতাবস্থায় ট্র্যাডিশন বিডি, সুলতান ডাইনসের মত কয়েকজন বড়লোকের কাচ্চি নিয়ে আবির্ভূত হলো, স্টারের দ্বিগুন দামে। অভিজাত এলাকা, সুরম্য পরিবেশ, প্রিমিয়াম প্রাইস, বেশী মাংস, নাম তার কাচ্চি। এসব কাচ্চির প্রচারে এগিয়ে এলো ব্যঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ফুড ব্লগাররা, যাঁদের অনেকেই হয়ত কখনো অথেনটিক পুরনো ঢাকার কাচ্চি খেয়ে দেখেনি। সুলতানের সাথে সাথে এল বেগম, কাচ্চি ভাই, কাচ্চি এক্সপ্রেস, কাচ্চিওয়ালা, মুঘল এমপায়ার, ক-তে কাচ্চি, এমন অসংখ্য উচ্চ বিত্ত কাচ্চির দোকানে ঢাকা শহর ছেয়ে গেল, যেভাবে আশির দশকের শুরু থেকে চায়নিজ রেষ্টুরেন্টের বাম্পার ফলন হয়ে ছিল। এখন ঢাকায় অনেক কাচ্চির দোকান, প্রচুর জনপ্রিয়, আছে প্রচুর গ্রাহক, তার চেয়ে বেশী আছে কাচ্চি রিভিউয়ার বা ভ্লগার, শুধু নেই কাচ্চি।
ক্রয় ক্ষমতার সাথে তাল মেলানোর জন্য স্টারের শুরু করা কাচ্চি কোন রকম নিভু নিভু করে জ্বলছিল, সুলতান ডাইনসরা এসে তাকে গুম করে দিল। তার বদলে অদ্ভুত এক খিচুরি বিক্রি শুরু হলো। ভ্লগাররা বলল “কাচ্চি ইজ সো টেন্ডার আর জুসি”, খদ্দেররা বলল ঠিক ঠিক ঠিক।
এতদিনে ঢাকা শহরের মানচিত্র পাল্টে গেছে। এক সময় পুরনো ঢাকা আর নূতন ঢাকা ছিল আধা আধা। ঢাকাইয়াদের খাবারে স্বকীয়তাকে পাল্টে দেয়া ছিল দুস্কর। এখন পুরনো ঢাকাই খুঁজে পাওয়া দায়, ঢাকাইয়া খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন।
আর হালের খিচুরি খেয়ে কেউ জোড় গলায় বলবে, ভাই এটা কাচ্চি না, এমন ভোজন বিলাসি সম্পূর্ন বিলুপ্ত। এখনও বিয়ে বাড়িতে অনেকে খান্দানি বাবুর্চি দিয়ে কাচ্চি রান্না হয়। কিছুদিন পর দেখা যাবে এসব ঝামেলা না করে অনেকে সুলতান ডাইন থেকে প্যাকেট এনে পরিবেশন করছে। এ ভাবেই আগামি কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকার সবচেয়ে সুস্বাদু এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে নিশ্চিত।
কাচ্চি কেন এনডেনজারড স্পেসিস?
-
এর কারন বলার আগে কাচ্চি রান্নার একদম সারাংশটুকু বলতে চাই।
কাচ্চি রান্নায় সাধারনত ১ কেজি চালে ২ থেকে আড়াই কেজি মাংস দেয়া হয়। কাচ্চির মাংসের জন্য সাধারনত ৮-১০ কেজি, ওজনের অল্প বয়সের খাসী বেছে নেয়া হয়। মানে খাসী বুড়া হয়ে বড় হলে চলবে না, স্বাস্থ্যবান ঘাড় মোটা খাসী হতে হবে। (এক সময় টিপু সুলতান রোডে শুধু কাচ্চী বিরিয়ানির জন্য মাংসের দোকান ছিল)
পুরো খাসী দিয়েই কাচ্চি হয়, তবে সম্ভ্রান্ত অনেক বাবুর্চি শুধু সিনা আর সামনের পায়ের মাংস চায়।
কাচ্চির পিস হতে হবে ১২৫-১৫০ গ্রামের মত, মানে কেজিতে ৬-৮ পিস। অনেকে এর চেয়ে বড় মাংস নেয়।
কাচ্চির মাংসের মসল্লা কখনোই কসানো হয় না, তাই এমন মসল্লা ব্যবহার করা হয় যাতে কাঁচা গন্ধ না আসে। তাই পোস্ত বাটা, জয়ত্রি, জয়ফল, বাদাম, গোল মরিচ, এলাচ দারুচিনি, কাঁচা মরিচ, কাশ্মিরি মরিচ, এমন মশল্লার আধিক্য থাকে। বাটা হলুদ-মরিচের মত মসল্লা থেকে বিরত থাকা হয়।
যেহেতু কাঁচা মাংস ভাপে রান্না হবে, তাই দীর্ঘ সময় মেরিনেশন করতে হয় এবং মেরিনেড হিসেবে দই, আদার মত এনজাইমিক মেরিনেড ব্যবহার করা হয়, কখনোই এসিডিক মেরিনেশন করা হয় না।
ভারত ও পাকিস্তানের দম বিরিয়ানি বাশমতি চাল দিয়ে করলেও ঢাকাই কাচ্চি সুগন্ধী দেশী চাল দিয়ে করা হয়, আর এজন্যই সে স্বাদে গুনে অনন্য। ( এখানে উল্লেখ্য, হালের সুলতান ডাইনসরা, বেশী দাম নেবার উছিলায় বাসমতি চালের নাম করে নিম্নমানের বিস্বাদ লং-গ্রেইন চাল ব্যবহার করে। পোলাও রান্নার আসল বাসমতি চাল ৫০০ টাকা কেজিরও উপরে)
তেজপাতা সহ গরম মসল্লা দিয়ে ফুটন্ত পানিতে চাল ঢেলে দিয়ে তাকে মিনিট ৫-৭ রাখলেই চাল ৭০-৮০% সিদ্ধ হয়ে যায়। সেই পানি ঝরানো আধা সেদ্ধ ভাত মেরিনেট করা মাংসের উপরে সাজিয়ে দেয়া হয়, সাথে কিছু আলু।
এবার পাতিল বা ডেগের মুখ ময়দার খামির দিয়ে সিলগালা করে অল্প আঁচে রেখে দেয়া হয় দীর্ঘ সময়। উপর দিকেও জলন্ত কয়লা দেয়া হয় ক্ষেত্র বিশেষে। আর মোটামুটি এ হলো কাচ্চি।
উপরে খাশীর বয়স, ওজন, মাংসের সাইজ, মসল্লার প্রকার, চাল, এসব উপকরন সমন্ধে যা যা বলা হয়েছে, কাচ্চির জন্য তা অত্যাবশ্যকীয়, এবং এর প্র্যত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে।
মাংসের সাইজ বড় হতে হয়, না হলে নরম রসালো মাংস রান্না হবে না। জীর্ন শীর্ন ৪-৬ কেজির ছাগল বা খাশীর মাংসে হাড়ের পরিমান বেশী হবে, মাংস হবে পাতলা, মাংসে ময়েশচার থাকবে খুবই কম, তাই কাচ্চি হবে না। কাচ্চির মাংস থেকে যে ভাপ বের হবে, সেটাই চালকে বাকিটা সিদ্ধ করে দেবে, এর সাথে সাথে সমস্ত চালে মাংসের ফ্লেভার চলে আসবে, যেটাই কাচ্চি বিরিয়ানিকে স্বতন্ত্র করে তোলে। পাক্কি বিরিয়ানিতে কখনোই চালের মধ্যে মাংসের ঘ্রান থাকবে না। তাই চাল ও মাংসের ১ঃ২ অনুপাত, সাদা মসল্লা, মাংসের সাইজ, প্রত্যেকটা ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু কাচ্চির মসল্লা সাদা-কালো, কাচ্চি রান্না হবার পরেও তা সাদাটে থাকে। অনেকের কাছে সেটা কিছুটা বিবর্ন মনে হতে পারে, এজন্য কেউ কেউ কাচ্চিতে ফুড কালার ব্যবহার করে। এছাড়া জাফরান দুধে ফুটিয়ে মেশানোতে কিছুটা গেরুয়া রং আসে। কাচ্চি বিরিয়ানি রান্নার পর মনে হবে শুধু পোলাও আর একদম রসালো নরম মাংসের মিশ্রন। লাল হলুদ মসল্লা, যেসব কসাতে হয়, তা কখনোই কাচ্চিতে ব্যবহার করা হয় না। কারন এতে কাঁচা মাংসের ময়েশচার থেকে পোলাওতে যে ফ্লেভার ছড়িয়ে পরবে, তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, মসল্লার গন্ধ আসবে।
যা হোক, আধুনা এলিট কাচ্চিতে সুলতান ডাইনস মসল্লা মিশিয়ে খিচুরির রূপ দিল। তার দেখা দেখি কাচ্চি ভাই বোন এক্সপ্রেস সবাই একই কাজ করল। প্রচার করতে লাগল কেউ তিন পিস মাংস দেয়, আবার কেউ চার পিস। সুতরাং সাইজ ছোট হতে লাগল, ছাগল হয়ে গেল কুকুর বিড়ালের সাইজ। মসল্লা জরজরিত চাল আর মাংসের মিশ্রণের নাম হলো “কাচ্চি”।
আমি কখনোই মনে করিনা এসব দোকান কুকুর হত্যা করে তা দিয়ে কাচ্চি রান্না করে। তবে তারা কাচ্চি বিরিয়ানি নামক ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারটিকে গলাটিপে হত্যা করেছে।
বাংলাদেশ থেকে কাচ্চি প্রায় বিলুপ্ত, আরেক দশক পরে কেউ হয়ত জানবেও না কাচ্চি আসলে কি।
আর কাচ্চিকে বিলুপ্ত করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান থাকবে সুলতান ডাইনসের।
রন্ধন শৈলীতে বিবর্তন বা ফিউশন, সব দেশে সব কালেই হয়ছে। কিন্তু বিবর্তন ও বিলুপ্তি এক জিনিষ নয়। সুলতান এন্ড গং খাবারে বিবর্তন আনেনি, এনেছে বিলুপ্তি।
ছবিঃ সংগ্রহকৃত ( শুধুই রং আর মসল্লার পার্থক্য বুঝানোর উদ্দেশ্যে)