04/02/2022
কিভাবে বাংলাদেশের চা গ্লোবাল মার্কেটে বিক্রয় করবেন ?
আসসালামু আলাইকুম
চা রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশি ক্রেতার উপর নির্ভরশীল হতে হয়। বিদেশি ক্রেতারা কম মূল্যে ভালো মানের চা ক্রয় করতে চায় এবং তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে প্যাকেটিং করে নিতে চায়।বর্তমানে বাংলাদেশের বেশ কিছু বড় কোম্পানি তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে চা রপ্তানি করছে বিভিন্ন দেশ। ছোট চা ব্যবসায়ীরা বা নতুন উদ্যোক্তারা কিভাবে নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করে বিদেশে চা রপ্তানি করে সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারবেন কোন রকম এজেন্ড বা ডিলার নিয়োগ ছাড়া নিম্নে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করছি।
বর্তমানে গ্লোবাল মার্কেটে সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা হচ্ছে আমাজান. কম(Amazon. com)। আমাজন সম্পর্কে সবারই কম বেশি ধারণা আছে । এই খুচরা বিক্রয় প্লাটফর্মে যে কেউ সেলার সেন্টার একাউন্ট খুলে নিজের ব্র্যান্ডের চা বিক্রি করতে পারবে সরাসরি ক্রেতার কাছে।
বাংলাদেশের বেশ কিছু চা বাগান আছে যাদের চা অনেক উন্নত মানের। সেসব বাগানের চা পাতা ক্রয় করে ভালো ব্লেন্ডার দ্বারা ব্লেন্ড করে আমাজনের বিভিন্ন দেশের মার্কেটপ্লেসে বিক্রয়ের ভালো সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশের এক থেকে পঞ্চম তম সেরা বাগান গুলো থেকে চা করে বিদেশে পাঠাতে পারলে কোয়ালিটির ব্যাপারে কোন রকম কমপ্লেন আসবেনা। এসব বাগানের চা নিলামে বিক্রি হয়ে থাকে তাই নিলাম থেকে ক্রয় করতে হবে। চা রপ্তানির ক্ষেত্রে নিলাম থেকে ক্রয় করার সময় কোন ভ্যাট প্রদান করতে হবে না শুধু ব্রোকারেজ এর কমিশন ও এক পারসেন্ট আয়কর প্রদান করতে হবে ।বাংলাদেশ চা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানির জন্য নিলাম থেকে চা ক্রয় করলে তা ১৮০ দিনের মধ্যে রপ্তানি করতে হবে।
চা রপ্তানি করতে কি কি কাগজ পত্রের প্রয়োজন?
১. ট্রেড লাইসেন্স
২. আয়কর সনদপত্র
৩. ভ্যাট সার্টিফিকেট
৪. ব্যাংক একাউন্ট
৫. বি এস টি আই এর জন্য স্যানিটেশন সার্টিফিকেট
৬. ট্রেডমার্ক এবং ব্র্যান্ড নাম রেজিস্ট্রেশন করা।
৭. বিএস টি আই এর অনুমতি নেওয়া
৮. কারখানার ফায়ার সার্টিফিকেট/ পরিবেশ ছাড়পত্র
৯. বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে চা খুচরা ও পাইকারি ক্রয়-বিক্রয়ের লাইসেন্স।
১০. বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে বিডার লাইসেন্স।
১১. বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে ব্লেন্ডারে লাইসেন্স।
১২. টি ট্রেডার্স এবং অ্যাসোসিয়েশন মেম্বারশিপ ।
১৩. কান্ট্রি অফ অরিজিন সার্টিফিকেট নিতে হবে চেম্বার অব কমার্স থেকে।
১৪. রপ্তানি লাইসেন্স (ERC)।
১৫.ফাইটোস্যানিটারি সনদপত্র
আমাজন সেলার একাউন্ট খুলতে কি কি কাগজপত্র লাগবে?
১. বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স,আয়কর এবং ভ্যাট এর সনদপত্র। অন্য দেশের ক্ষেত্রে এল এল সি লাইসেন্স ও সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার।
২. বৈধ পাসপোর্ট
৩. জাতীয় পরিচয় পত্র
৪.কোম্পানির ব্যাংক একাউন্ট
৫. ব্যাংক স্টেটমেন্ট
৬. ক্রেডিট কার্ড
৭. ফোন নাম্বার
৮. ইমেইল এড্রেস
৯. ডোমেইন এর নাম
১০. ইউটিলিটি বিলের কপি
আমাজানের মার্কেটপ্লেসে দেশগুলোর নাম নিচে দেওয়া হল:
১. নর্থ আমেরিকা - আমেরিকা, কানাডা. মেক্সিকো ও ব্রাজিল
২. ইউরোপ- ইউনাইটেড কিংডম, জার্মান, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, তুর্কি, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড এবং পোল্যান্ড।
৩. এশিয়া- জাপান, ইন্ডিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া।
৪. মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা- দুবাই, সৌদি আরব এবং মিশর।
এসব মার্কেটপ্লেসে সে দেশের নিয়ম নীতি মেনে চা রপ্তানি করতে হবে। এটি কোন কঠিন বিষয় নয়।
আমেরিকায় বিক্রি করতে কি কি কাগজপত্রের প্রয়োজন ?
১.FDA ( খাদ্য এবং ওষুধ প্রশাসন) এর অনুমোদন পত্র।
২. ট্রেডমার্ক নিবন্ধন করা
৩. ব্র্যান্ড নাম রেজিস্ট্রেশন এর জন্য আমাজনে আবেদন করতে হবে।
বর্তমানে সবচেয়ে ভালো চা নিলামে বিক্রি হয়ে থাকে প্রতি কেজি ২১০টাকা থেকে ২৩০টাকার মধ্যে, তবে এ সময়ের চা রপ্তানি করা উচিত হবে না। নতুন মৌসুমের চা ক্রয় করে পাঠালে ভালো হবে। আশা করা যায় সে সময় চায়ের মূল্য হবে প্রতি কেজি ২৭০ টাকা থেকে ৩০০টাকার মধ্যে ।নতুন মৌসুমে যদি ৩০০ টাকায় প্রতি কেজি চা ক্রয় করা যায় তা হলে ডলারে এর মূল্য দাঁড়াবে প্রতি কেজি $ ৩.৫০ । ২০০ গ্রাম ও ৫০০ গ্রামের ভালো মানের কাগজের বক্স দিয়ে প্যাকেট তৈরি করলে সর্বোচ্চ খরচ হবে প্রতি কেজি চা $ ৪.৫০ ডলার। এর সাথে যোগ হবে কারখানার খরচ, বাংলাদেশ থেকে পাঠানোর খরচ , আমাজনে বিজ্ঞাপনের খরচ ও আমাজানে ওয়্যারহাউজেৱ ভাড়া।
আমাজনে কিছু চা বিক্রয়ের মূল্য নিচে দেওয়া হল:
২২৬ গ্রাম চা বিক্রি হয় ৪.৫০ ডলার
৫০০ গ্রাম চা বিক্রি হয় ৮.৭০ ডলার
৯০০ গ্রাম চা বিক্রি হচ্ছে ১৫.৭৫ ডলার
amazon.com এ সার্চ করলে দেখতে পারবেন।
আমাজনে কোন গ্রেডের চা বিক্রয় করা যেতে পারে?
১. সিটিসি- ছোট বিওপি সাইজ বা জিবিওপি সাইজের বেস্ট কোয়ালিটির চা ।
২. গ্রিন টি- গ্রিন টি'র প্রচুর চাহিদা আছে, তবে এর ক্রয় মূল্য একটু বেশি পড়বে বাংলাদেশে।
৩. অর্থোডক্স- বাংলাদেশের চা বাগানরা এটির উৎপাদন খুবই সামান্য করে থাকে তাই এর মূল্য অনেক বেশি পড়বে এবং কিছু বাগান সরাসরি তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড প্যাকেট করে থাকে।
৪. টি ব্যাগ- ভালো মানের টি-ব্যাগের চাহিদা প্রচুর, অবশ্যই এটি ডবল চেম্বারে হতে হবে এবং কোন প্রকার স্টেপলারের পিন থাকতে পারবে না টি ব্যাগে ।
আমাজনের দুই ধরনের সেলার একাউন্ট আছে।
১. ব্যক্তিগত (Individual)
২. পেশাদার (Professional) , এ অ্যাকাউন্টের জন্য মাসে 39.99 ডলার প্রদান করতে হবে আমাজানকে।
আমাজনে দুই ধরনের পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রি করা যায়।
১.FBA(Fulfillment by Amazon) এ পদ্ধতিতে আমাজন নিজে সকল প্রকার কাজ সমাধান করে থাকে।
২.FBM (Fulfillment by Merchant) এ পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীদেরকে সকল কাজ সমাধান করতে হয়।
প্রথম পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে আমাজনে চা পাঠাতে হবে।
FBA পদ্ধতিতে , কোন বিক্রেতা যখন আমাজানের সেলার সেন্টার একাউন্টে পণ্যের বিবরণ , তালিকা এবং পণ্যের মূল্য প্রদান করে থাকে তখন সে বিক্রেতাকে আমাজান ওয়্যার হাউজের ঠিকানা প্রদান করে , এরপর সে বিক্রেতা উক্ত ঠিকানায় পণ্য পাঠিয়ে থাকলে আমাজান তা গ্রহণ করে বিক্রয়ের জন্য তার সিস্টেমকে সক্রিয় করে দেয় । আমাজান প্রত্যেক মাসে বিক্রেতার কাছ থেকে থেকে ওয়্যারহাউজ এর ভাড়া নিয়ে থাকে। আমাজান মাসে দুইবার পণ্য বিক্রয়ের টাকা বিক্রেতার ব্যাংকে জমা করে থাকে।
বিশ্ববাজারে নিজের ব্যান্ড তৈরি করতে পারলে বিভিন্নভাবে লাভবান হতে পারেন উদাহরণস্বরূপ :
১.আপনার ব্র্যান্ডটি বিশ্ববাজারে বিক্রি করে ভালো লাভবান হতে পারেন ।
২. আপনার ব্র্যান্ডের চা অন্য মার্কেটপ্লেসের বিক্রেতারা আপনার কাছ থেকে পাইকারি মূল্যে ক্রয় করে তাদের নিজস্ব মার্কেটপ্লেসে বিক্রয় করতে পারে ।
যে সকল ভাইরা ও ক্ষুদ্র চা ব্যবসায়ী বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা করতে কষ্ট হচ্ছে তারা সহজে আমাজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের চা বিক্রি করে লাভবান হতে পারেন।