01/05/2026
জিয়ৎ কুণ্ড — শৈশবের রূপকথা থেকে প্রাচীন সভ্যতার জল ইতিহাসে ফিরে দেখা মহাস্থানগড়
ছোটবেলায় গ্রামের বয়স্ক মানুষদের মুখে একটা গল্প খুব শুনতাম—
“মহাস্থানগড়ে এমন এক কূপ আছে, যার পানি মৃত মানুষকেও জীবিত করতে পারতো!”
তখন এসব গল্প শুনে মনে হতো, পৃথিবীর কোথাও নিশ্চয়ই এমন এক রহস্যময় স্থান আছে যেখানে ইতিহাস আর অলৌকিকতা পাশাপাশি বাস করে। সন্ধ্যার পর উঠানে বসে দাদাদের মুখে শুনতাম রাজা পরশুরাম, শাহ সুলতান বলখী মহীসওয়ার আর সেই “অমর কূপ”-এর গল্প। শিশুমনে তখন মহাস্থানগড় মানেই ছিল রহস্যে ঢাকা এক হারানো নগরী।
আজ বহু বছর পর ইতিহাসপ্রেমী হয়ে যখন মহাস্থানগড়ে দাঁড়ালাম, তখন হঠাৎ বুঝলাম— শৈশবের সেই গল্পগুলো আসলে শুধু লোককথা ছিল না, এর গভীরে লুকিয়ে আছে মানুষের হাজার বছরের টিকে থাকার ইতিহাস।
জিয়ৎ কুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি কূপ দেখছি না— আমি দেখছি সভ্যতার জন্মের অন্যতম শর্তকে।
কারণ পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্রেই ছিল পানি।
মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা গড়ে উঠেছিল টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর তীরে, মিশরের সভ্যতা নীলনদের বুকে, সিন্ধু সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক নগর গড়ে তুলেছিল উন্নত জলব্যবস্থার মাধ্যমে। মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী বসতি গড়তে শিখলো, তখন প্রথম যে জিনিসটির প্রয়োজন হয়েছিল তা হলো পানির নিরাপদ উৎস।
পানি তখন শুধু তৃষ্ণা মেটানোর উপায় ছিল না—
পানি মানেই ছিল জীবন, কৃষি, জনপদ, যুদ্ধ এবং ক্ষমতা।
ভারতীয় উপমহাদেশেও তাই কূপ, দিঘি, বাঁওড় আর জলাধারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। রাজা-বাদশাহরা মন্দির, মসজিদ বা দুর্গ নির্মাণের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন পানির উৎস তৈরিতে। কারণ যে ভূখণ্ডে পানির নিয়ন্ত্রণ, সেই ভূখণ্ডেই টিকে থাকে সভ্যতা।
মহাস্থানগড়ও তার ব্যতিক্রম নয়।
এটি তো বরেন্দ্র ভূমির অংশ— সমতল বাংলার তুলনায় অনেক উঁচু এলাকা, যেখানে পানির স্তরও অনেক নিচে। আজ থেকে মাত্র ৫০ বছর আগেও বাংলার অধিকাংশ গ্রামে নলকূপের বদলে মানুষ নির্ভর করতো কুয়ার উপর। মহাস্থানগড়ের পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও পুরনো কুয়ার চিহ্ন দেখা যায়।
তাই জিয়ৎ কুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে—
এই কূপকে ঘিরে যতটা অলৌকিক কাহিনি প্রচারিত, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব এর অস্তিত্ব।
হয়তো এই কূপই কোনো একসময় মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
খরায়, যুদ্ধে কিংবা পানির সংকটে এই কূপ ছিল আশ্রয়।
আর মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী যেকোনো কিছুই ধীরে ধীরে অলৌকিকতার রূপ নেয়।
সম্ভবত সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে সেই কিংবদন্তি—
রাজা পরশুরাম নাকি এই কূপের পানি পান করিয়ে মৃত সৈনিকদের জীবিত করতেন! পরে শাহ সুলতান বলখী মহীসওয়ার এক চিলের মাধ্যমে গরুর মাংস কূপে ফেলে এর অলৌকিক শক্তি নষ্ট করে দেন।
প্রচলিত মিথের সত্য-মিথ্যা যাচাই চাইতে এই যে মিথের ভিতরে ইতিহাস লুকিয়ে থাকার দিকটা সবচেয়ে সুন্দর— এখানে বাস্তবতা আর লোকবিশ্বাস একে অপরকে ছাপিয়ে যায় না, বরং একসাথে বেঁচে থাকে।
জিয়ৎ কুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তাই আমার মনে হচ্ছিল, আমি কোনো নিছক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেখছি না—
আমি দেখছি মানুষের পানির জন্য সংগ্রাম, সভ্যতার জন্ম, বাংলার লোককথা আর নিজের শৈশবকে।
হয়তো এজন্যই ইতিহাস আমাকে বারবার টানে।
কারণ ইতিহাস শুধু অতীত নয়, ইতিহাস মানে মানুষের বেঁচে থাকার গল্প।
জিয়ৎ কুণ্ড, মহাস্থানগড়, বগুড়া
— যেখানে একটি কূপের ভিতর লুকিয়ে আছে সভ্যতা, লোকবিশ্বাস আর বাংলার হাজার বছরের জল ইতিহাস।
লেখক : সরকার রায়হান
১-৫-২০২৬
#মহাস্থানগড় #জিয়ৎ_কুণ্ড
#বরেন্দ্র_ভূমি #বাংলার_ইতিহাস
#লোককথা #প্রাচীন_সভ্যতা
#বাংলাদেশের_ইতিহাস
#ঐতিহাসিক_ভ্রমণ #বাংলার_লোকগাথা